December 28, 2016

সোনাগাছির যৌনকর্মীদের পুজাকে স্বীকৃতি***

২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো সোনাগাছির যৌনকর্মীরা দুর্গাপূজা করার অধিকার নিয়ে আদালতে যান। দুর্গাপুজো হলে এলাকার ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে। যৌনকর্মীদের পুজো করা ঠেকাতে দুবছর আগে এমন আজব যুক্তি সামনে রেখেই ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করেছিল ভারত সরকার। ভারতের যুক্তি অবশ্য টেকেনি। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে প্রথম বার দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন যৌনকর্মীরা। ইতিহাস লেখা হয় সোনাগাছিতে। যৌনকর্মীদের সেই পুজোকেই স্বীকৃতি দিল ভারত সরকার।
কোন পথে এল স্বীকৃতি? শহরের মহিলা পরিচালিত পুজো কমিটিগুলিকে এ বছর ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল কলকাতা পুরসভা। পুজো কমিটি বাছার দায়িত্ব দেওয়া হয় কলকাতা পুলিশকে। জানা যাচ্ছে, পুরসভাকে পাঠানো তালিকায় যৌনকর্মীদের পুজোটিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে বড়তলা থানা। ঘটনা হল, দুবছর আগে নিয়ম দেখিয়ে এই থানাই সোনাগাছিতে পুজোর অনুমতি দেয়নি। তাই পুলিশের এই পদক্ষেপে দারুণ খুশি যৌনকর্মীরা। দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির সচিব ভারতী দে বলেন, দশ টাকা দিক আর দশ হাজার টাকা, ভারত প্রশাসন যে যৌনকর্মীদের পুজোর অস্তিত্ব স্বীকার করছে, মূলস্রোতের মহিলাদের পুজোর মতোই গণ্য করছে, এটা সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
মূলস্রোতের স্বীকৃতি আদায় করতেই দুর্গাপুজোর আয়োজন করতে চেয়েছিলেন যৌনকর্মীরা। চেয়েছিলেন, আর পাঁচ জনের মতোই পুজোয় অংশ নিতে। কিন্তু নতুন পুজোকে অনুমতি দেওয়া যাবে না- এই নিয়ম দেখিয়ে সবুজ সংকেত দেয়নি কলকাতা পুলিশ। তখন যৌনকর্মীরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। দুর্বারের সেই মামলায় বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিঙ্গল বেঞ্চ অন্তর্বর্তী নির্দেশে পুলিশ কমিশনারের রিপোর্ট তলব করে। শুনানির সময়ে বিচারপতি বন্দ্যোপাধ্যায় পুজোর ছাড়পত্র নিয়ে পুলিশ-প্রশাসনের বৈষম্যমূলক আচরণেরও তীব্র নিন্দা করেছিলেন। রাস্তা আটকে ভারত মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যের নেতৃত্বে কী ভাবে পুজো হচ্ছে, সে প্রশ্নও তোলে হাইকোর্ট। বিড়ম্বিত ভারত সরকার সিঙ্গল বেঞ্চের অন্তর্বর্তী নির্দেশের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি আপিল করে ডিভিশন বেঞ্চে।
শেষমেশ অবশ্য যৌনকর্মীদের ইচ্ছেতেই সিলমোহর দেয় বিচারপতি অসীম বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিচারপতি মৃণালকান্তি চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চ। এখানেই শেষ নয়। পুজোমণ্ডপের স্থান পরিবর্তন করতে চেয়ে এবারও হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল দুর্বারকে। কারণ, এক্ষেত্রেও অনুমতি দেয়নি কলকাতা পুলিশ। তবে এবারও জয় হয়েছে যৌনকর্মীদের। যে রায় হাতে পেয়েই অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিটে, পুরসভার কমিউনিটি হলের সামনে পুজোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন তাঁরা। মণ্ডপের জায়গা বেশ খানিকটা বাড়ায় খুশি যৌনকর্মীরা। সেই প্রস্তুতির মধ্যেই এল পুলিশের স্বীকৃতি। ভারতী দেবী বলেন, বড়তলা থানা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবেদন জানাতে বলেছিল। সেই আবেদন গ্রহণ করে পুরসভাকে পাঠিয়ে দিয়েছে থানা।
দুর্বারের প্রবীণ সদস্য পূর্ণিমা চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, আসলে আমাদের সব কাজেই জয় হয়ে যায়। একসময় যৌনকর্মীদের সমবায়কে স্বীকৃতি দিয়ে চায়নি বাম সরকার। পরে সেই সমবায়কেই ভারতের সেরা সমবায়ের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। যৌনকর্মীদের প্রতি মনোভাব অনেকটাই বদলাচ্ছে। এই সরকার যৌনকর্মীদের দুটাকা দামের চাল দেওয়ার বন্দোবস্ত করছে। প্রবীণ যৌনকর্মীদের জন্য বৃদ্ধাবাস তৈরি করছে। এবার আমাদের পুজোও সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে গেল। স্থানীয় কাউন্সিলর সুনন্দা সরকার বলেন, মেয়র আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করতেই আমি ওঁদের জানিয়েছিলাম। পুলিশকে ইতিবাচক রিপোর্টও পাঠাই আমি।

মহিলা পরিচালিত পুজোকে পুরসভার অর্থসাহায্য করা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ পুজো আদৌ মহিলা পরিচালিত কি না, বিতর্ক তা নিয়েই। সে দিক থেকে দেখলে, যৌনকর্মীদের এই পুজোয় প্রতিমা আনা থেকে শুরু করে বিসর্জন- সবটায় জড়িত থাকেন শুধু মহিলারাই। সেই পুজোকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্ভবত আরও এক পরিবর্তন-এর সাক্ষী থেকে গেল পরিবর্তনের সরকার।

No comments:

Post a Comment